আভিজাত্যের শীতলতা
আভিজাত্যের শীতলতা

এই ছবি আমার নানার বাড়ির অনেক আগের একটা ঘর। একশ বছর আগের এই টিনের ঘরটা। গ্রামের প্রথম টিনের ঘর। এখনো টিকে আছে। পরিত্যক্ত হলেও তার মায়া কেউ কাটাতে পারেনা। এই ঘর কালের সাক্ষী। ব্রিটিশ শাসন দেখেছে, দেখেছে উপমহাদেশের বিভক্ত হওয়া।কালে কালে কত লর্ড দেখেছে !তারপর বায়ান্ন। এই ঘরেই শত মায়ের ভাষা শিখেছে সহস্র ছেলেমেয়ে। আমার নানার ১২টা ছেলেমেয়ের এখন শতাধিক শাখা প্রশাখা।এই ঘরেই তাদের আঁতুড় কেটেছে।স্বাধীনতার ডাকের সাক্ষী এই ঘর, সদর্পে আজও তাই দাড়িয়ে রয়েছে নিজ মহিমায়। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, খাবার তৈরী করেছে এই ঘরে, এই বাড়িতে। এই ঘরে ছিল একটা রেডিও, তার নব ঘুরিয়ে বিভিন্ন চ্যানেলের মুক্তিযুদ্ধের খবর শুনেছে পুরো গ্রামের মানুষ।তারপর স্বাধীনতা পরবর্তী আমাদের জেনারেশনতো আছেই। সময়ের পরিক্রমায় চাবি বদল হয়েছে এই ঘরে। অবশেষে ছোট মামার ভাগে পড়েছে এই ঘর।আমরা যখন ছোট ছিলাম এই ঘরে ঘুমোতাম। এই ঘর সবচে শীতল বলে।ঘরের উপর ছায়াদানকারী আমড়া গাছ, কামরাংগা গাছ আরো বেশি কিছু গাছ ছিল। বাড়ির সামনের উঠোনটায় কাজিনরা মিলে কত খেলেছি।জোসনারাতে বারান্দায় বসে যাত্রা বা পালার গান শুনতে শুনতে কোলে ঘুমিয়ে গেছি। শীতকালে পরীক্ষা শেষে গ্রামে যেতাম। দাদার বাড়ি, নানার বাড়ি একই গ্রামে হওয়ার নানার বাড়ি যাওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। আর শীতকালে এই ঘরে ঘুমানোর সময় টুপটুপ কুয়াশায় শব্দ শুনেছি।আমার বয়স এখনো তিনযুগ পেরোয়নি। এরই মাঝে জমেছে এই ঘরের বর্নণাতীত গল্প। এইবার নানাবাড়ি গিয়েই হঠাৎ করে মায়া লাগল। ভেতরে সেই মাচা, ধানের বেড়, ফুলমাচা, এখনো রয়েছে। মামার সাথে কথা বলছিলাম আর জিজ্ঞেস করছিলাম সিন্দুকটা এখনো আছে, আপনাদের ছোট বেলার খড়মগুলো আর শিকে, হারিকেন, কুপি? হ্যাঁ আছে।এইগুলো আমিও দেখেছি। এখনকার বাচ্চারা হারিক্যান দেখেনি, শিকে দ্যাখেনি। আমি বললাম এটাতো গ্রামের জাদুঘর, ঐতিহ্যের ঘর। কেউ থাকেনা না? মামার ছোট ছেলেটা বলল:আপা আমি থাকি! আমিতো অবাক হচ্ছিলাম, তাও ওর মহাসুন্দরী বউ নিয়ে এই পরিত্যক্ত ঘরে! আমার অবাক হওয়া দেখে বলল, এই ঘরটা এখনো খুব শীতল, তাই থাকি! আমি এইবার বুঝলাম এই শীতলতার অর্থ। যে ঘর বছর, যুগ, শতাব্দী পার করেছে তার ভেতর শীতলতা থাকবেই! ঐতিহ্যের গন্ধ, ইতিহাসের গন্ধ,তাঁর মায়ার বাধঁন বড় শক্ত। তাই কর্পোরেইট টাইলস ওদের টানেনি। আভিজাত্যের শীতলতায় সবার প্রান জুড়োয় এখনো –এই শতাব্দীকাল ধরে টিকে থাকা টিনের চালের ঘরটা। আমরা চাই যথাযথভাবে সংরক্ষিত হোক আরও সহস্রাব্দকাল– আভিজাত্যের শীতলতা। ০৬/০৭/২০১৬