পাত্র বনাম পাত্রী
পাত্র বনাম পাত্রী

যেভাবে কিছুদিন ধরে ডাক্তার ছেলেদের ডাক্তার মেয়েদের বিয়ে করা উচিত কি উচিত না, ডাক্তার ছেলেদের লিখালিখি পড়ছি। তাতে আমার নিজের কিছু কথা বলা দরকার মনে করছি। আমি একজন ডাক্তার, আমার হাজব্যান্ড একজন ডাক্তার, আমার প্রায় নয়বছরের বিবাহিত জীবন। আমার একছেলে, এক মেয়ে। আমার হাজব্যান্ড নয়বছরের মধ্যে কোনদিনও এমন কথা বলেননি বা বোঝাননি যে আমি তার জন্য পারফেক্ট না বা আমার সাথে তার এডজাস্ট হয়নি। আমি সরকারী চাকুরী করছি প্রায় তিন বছর, আর আমার মেয়ের সাড়ে ছয়বছর। মানে সাড়ে তিনবছর আমি চাকুরী বা ডাক্তারী করিনি। সেই সময় বা এই সময় আমি আমাদের সম্পর্কের কোন পাথর্ক্য বুঝিনি, বরং রিলেশনশীপে ভালবাসা বাড়ছে। এটা ঠিক যে একটা মেয়ে যখন চাকুরী বা কোন কাজে ব্যস্ত থাকে তার স্ট্রাগল অনেক বেশি। এই বেশির পাশে যখন হ্যাজব্যান্ড থাকে তখন সেই স্ট্রাগলটা সফলতার মুখ দেখে। বাকি রইল বাচ্চা পালন। স্বীকার করি, এখানে মেয়েদের ভূমিকা বেশি রাখতেই হয়। আমার কর্মক্ষেত্র ই ছিল আমার বাসা। আমার হাজব্যান্ড যে পরিমাণ বাচ্চাদের ভালবাসেন এবং যত্ন নেন।আমারতো মনে হয়না এইটুক ভালবাসা থাকলে কোন হাজব্যান্ড বউয়ের চাকুরী করা না করা নিয়ে ঝামেলা করবে। বউ চাকুরী না করল ভাল কথা! কিন্তু তার উপর সমস্ত দায়িত্ব দিয়ে দেয়ার অর্থ হল সেই পুরুষটি ঘরের ব্যাপারে উদাসীন। এই কারণেই বলছি, আমি যখন চাকুরী করিনি, তখন ও আমার হাজব্যান্ড তার চাকুরী থেকে এসে বাচ্চাদের খাওয়াত,খেলত, রাত জাগত। এটা তার দায়িত্ববোধ আর ভালবাসা। আর এখন আমি চাকুরী করছি, পুরো সংসারটা আমিই চালাই, বাজার থেকে শুরু করে সব। কারণ আমার হাজব্যান্ড এখন কোর্সে আছে। তার খরচ চালাতে তাকেই হিমশিম খেতে হয়।একটা সাপোর্টিং রেখেছি হাজব্যান্ড কোর্সে চলে যাওয়ার পর। আমি চাকুরী না করলেও এই সাপোটিং লাগত। ডাক্তার মেয়ে নিয়ে ক্যান এত কথা। আমি যদি ইঞ্জিনিয়ার বা অন্য প্রফেশানের হতাম তখনও একই হত। আর বাকি রইল চাকুরী না করা নিয়ে! হ্যাঁ ডাক্তার হয়েও আমি চাকুরী না করতে পারতাম। সেই ক্ষেত্রে যাদের ডাক্তার বউ নিয়ে আপত্তি, তাদের আর আপত্তি থাকতনা। কিন্তু আমি আমার হাজব্যান্ডের অনুপ্রেরণাতেই বিসিএস দিয়েছিলাম দুটো বাচ্চার মা হয়েই। যারা জীবনসংগীকে মূল্যায়ন করার মত বড় মানসিকতার পরিচয় দিতে পারেননি তাদের জন্য আফসোস। যেসব ছেলেরা বেশি ক্যারিয়ার লোভী তারাতো চাইবেনই, তার বউ তার বাসার কাজের লোক হয়ে থাকুক।যারা এই লোভটা করেননা, তাদের ওয়াইফ চাকুরী করুক আর নাই করুক, তারা অর্থনৈতিক সাপোর্ট ছাড়াও বউকে সাপোর্ট দেন।অথবা ঘরে সহযোগীতার জন্য কাজের লোক রেখে দেন। তাই বাচ্চারা মা চাকুরী না করলেও কাজের লোকের কাছে কোন না কোন ভাবে থাকেই। কারণ মা কে তো তার খাওয়া গোসল করতে হয়। মেয়েরা অনেক এগিয়ে। তাই কিছু ছেলে এইধরনের অযৌক্তিক চিন্তা করে আরো অথর্ব কিছু ছেলেদের উস্কানি দেয় এই অর্থে মেয়েদের শিক্ষিত হওয়ার দরকার নেই। শিক্ষিত হলেই আবার চাকুরী করতে চায় কিনা! খুবই দু:খজনক। একটা মেয়ে চাকুরী যদি নিজের ইচ্ছেতেও না করে তার সমাজে অনেক দায়িত্ব থাকে। সমাজ গঠনমূলক অনেক কাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে তাকে ঘরের কাজের মানুষ হিসেবে ট্রিট করা, নিজের বউ বা ভালবাসার মানুষটাকে অপমান করার শামিল। ঘরেতো আমরাও কাজ করি, রান্না করি, সব করি। সত্যিকার অর্থে দরকার ভালমানুষ হওয়া। বউ ডাক্তার বা নন মেডিক্যাল বা অন্য পেশার অথবা গৃহিণী হোক এটা কোন ব্যাপারনা। জীবন সংগীকে মূল্যায়ন করাই সত্যিকারের পুরুষত্বের প্রমাণ। যারা এখনো বিয়ে করেননি বা বিয়ে করবেন, তাদের বেশি দরকার মেয়ের মূল্যবোধের পরিচয় পাওয়া। সে চাকুরী না করলেও আপনি শান্তি পাবেননা যদি তার মূল্যবোধ না থাকে। আর ডাক্তারী করুক বা অন্য চাকুরী করুক, তার মূল্যবোধ থাকলে তার অই টাইটেল বড় কিছুনা। প্রয়োজনে সে চাকুরী ছাড়তেও পারবে, প্রয়োজনে করতেও পারবে। আজ ভেবেছিলাম নিজের বাবাকে নিয়ে লিখব। কিন্তু আজ এলোমেলো কিছু লিখতে হল আমার বাচ্চাদের বাবাকে নিয়ে! সেরা বাবা, স্যালুট তোমাকে!! ১৮/০৬/২০১৭